১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, বঙ্গবীর জেনারেল এমএজি ওসমানী-এর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৮৪ সালের এই দিনে তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে তার মরদেহ দেশে আনা হলে সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সিলেট ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া, আলোচনা সভা ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী শৈশব থেকেই মেধা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণের পরিচয় দেন। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তার সামরিক জীবনের সূচনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন এবং অল্প বয়সেই মেজর পদে উন্নীত হন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্ব জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। মুজিবনগর সরকার তাকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিলে তিনি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত কৌশলে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তার নির্দেশনায় পুরো বাংলাদেশকে ১১টি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়, যাতে প্রত্যেক অঞ্চলে একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয় এবং শত্রুপক্ষের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা যায়।
সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক বৈঠকে তিনি গেরিলা যুদ্ধ ও সম্মুখ যুদ্ধের সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করেন। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালানো, শত্রুপক্ষের রসদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে দুর্বল করে তোলা হয়। তার অনুমোদনেই পরিচালিত ঐতিহাসিক অপারেশন জ্যাকপট-এ নৌ-কমান্ডোরা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে পাকিস্তানি জাহাজে সফল আঘাত হানে। এই অভিযানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের শক্ত অবস্থান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে গঠিত সরকারে তিনি জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা সংগঠকদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন নীতিনিষ্ঠ ও আপসহীন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিবাদে সংসদ সদস্য পদ থেকে তার পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নীতির প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্রের বিকল্প কেবল আরও শক্তিশালী গণতন্ত্রই হতে পারে।
দেশে ও বিদেশে তার স্মৃতি সংরক্ষিত রয়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানে। সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন এবং সিলেট নগরের নাইওরপুলে অবস্থিত ওসমানী জাদুঘর তার নাম বহন করছে। তার পৈতৃক নিবাস ‘নূর মঞ্জিল’-এ প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে তার ব্যবহৃত সামগ্রী, নথিপত্র ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলা তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে নামকরণ করা হয়েছে। বিদেশেও, যুক্তরাজ্যের লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় অবস্থিত ওসমানী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে তার নাম অমর করে রেখেছে।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৫ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। বিভিন্ন সময়ে তার ছবি সম্বলিত স্মারক ডাকটিকিট ও স্মারক মুদ্রাও প্রকাশ করা হয়েছে।
মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বঙ্গবীর জেনারেল এমএজি ওসমানী বাঙালি জাতির হৃদয়ে চিরজাগ্রত। তার রণকৌশল, দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও নীতিনিষ্ঠতা আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই সর্বাধিনায়কের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা চির অম্লান থাকবে।
লেখক: মো: জিসান রহমান
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।