পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে বিশেষত মালিতে বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আল-কায়েদার সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা জেএনআইএম (JNIM), যারা এখন কেবল মালির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই বরং বুরকিনা ফাসো, নাইজার এবং বেনিন-টোগোর সীমান্ত পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। 



সাদা অংশ মালিতে JNIM এর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল। ছবি - Wikipedia 

আল-কায়েদা (AQIM) থেকে উদ্ভূত এই গোষ্ঠীটি একদিকে মালি সরকার ও সরকারের মিত্র রুশ ভাড়াটে বাহিনী 'ভ্যাগনার গ্রুপ'-এর বিরুদ্ধে লড়ছে, আবার অন্যদিকে আদর্শিক ও এলাকা দখলের দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট (ISGS)-এর সাথে। 

মজার বিষয় হলো, তুয়ারেগ বিদ্রোহীরা (CSP-DPA) মূলত ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী হলেও, মালি সেনাবাহিনী ও রুশ ভ্যাগনার গ্রুপের সাঁড়াশি অভিযান মোকাবিলায় তারা বর্তমানে আল-কায়েদা সমর্থিত জেএনআইএম-এর সাথে এক ধরনের কৌশলগত ও অঘোষিত সামরিক সমন্বয় করছে। যদিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হারানোর ভয়ে তুয়ারেগরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তারা একে অপরের জন্য গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করছে। বিশেষ করে সম্প্রতি টিনজাউয়াতেন সীমান্তে রুশ বাহিনীর বড় ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে এই দুই গোষ্ঠীর পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল মূল চাবিকাঠি। 

তবে এই ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কঠিন; কারণ তুয়ারেগদের লক্ষ্য একটি স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে জেএনআইএম-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পুরো সাহেল অঞ্চলজুড়ে শরিয়াহ শাসন কায়েম করা-যা এই দুই মিত্রের মধ্যে যেকোনো সময় বড় সংঘাতের বীজ বপন করতে পারে।



লাল অংশ বুরকিনা ফাসোতে JNIM এর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল। ছবি - Wikipedia 

তবে এত প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও জেএনআইএম-এর পক্ষে সহসাই মালির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে সিরিয়া বা আফগানিস্তানের মত সরকার গঠন করা সম্ভব নয়; কারণ একদিকে যেমন মালি সেনাবাহিনী রুশ অত্যাধুনিক আকাশপথের সুরক্ষা ও সমরাস্ত্রের সহায়তা পাচ্ছে, তেমনি জেএনআইএম-এর উগ্র আদর্শকে মালির প্রতিবেশী সাহেল রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না। 


এছাড়া প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশ আলজেরিয়া তাদের সীমান্তে একটি পূর্ণাঙ্গ জিহাদি রাষ্ট্র কখনোই বরদাশত করবে না এবং ইসলামিক স্টেটের (ISGS) সাথে জেএনআইএম-এর চলমান রক্তক্ষয়ী অন্তর্কন্দোল তাদের শক্তিকে ভেতর থেকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে।


বর্তমানে জেএনআইএম-এর রণকৌশল কেবল যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা রাজধানী বামাকোকে (Bamako) এক ধরনের অদৃশ্য অবরোধের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। রাজধানীর সাথে সংযোগকারী প্রধান সড়কগুলোতে নিয়মিত হামলা চালিয়ে তারা খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। ২০২৪-২৫ সালে সুরক্ষিত বিমানবন্দরে ও সামরিক স্থাপনায় তাদের সাহসী হামলাগুলো প্রমাণ করেছে যে, তারা রাজধানীর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। তাদের লক্ষ্য সরাসরি শহর দখল নয়, বরং অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়া।


লেখক - হাসান ইবনে খোকন