গোড়ার মসজিদ, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ইউনিয়নের বেলাট গ্রামে অবস্থিত, মাটির নিচে চাপা পড়া এক জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী। কথিত আছে, সুলতানি আমলের হোসেন শাহ ও তাঁর ছেলে নুসরত শাহের আমলে এই মসজিদের গোড়াপত্তন স্থাপিত হয়। ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় লোককথা অনুসারে, গোরাই শাহ নামক এক মুসলিম সুফি দরবেশ বারোবাজার অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) শিষ্য ছিলেন এবং বারোবাজারের পাশের বেলাট দৌলতপুর গ্রামে এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। সুফি গোরাই শাহের নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয় ‘গোরার মসজিদ’ বা ‘গোড়ার মসজিদ’। মসজিদের পাশেই রয়েছে কয়েকশ বছরের পুরোনো একটি কবর, যা ধারণা করা হয় সুফি গোরাই শাহ দরবেশের।


প্রত্নতত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্যমতে, মসজিদটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো। সুলতান হোসেন শাহ ও পরে তাঁর ছেলে নুসরত শাহের শাসনামলে ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, যশোর ও খুলনার অঞ্চলে সুফি-দরবেশরা ইসলাম ধর্মের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের হাতেই পারস্য ও সুলতানি স্থাপত্যশৈলীর আদলে গোড়ার মসজিদের নকশা তৈরি হয়। মসজিদটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট, এবং ছাদের কার্নিশে দৃষ্টিনন্দন পোড়ামাটির কারুকাজ রয়েছে।


স্থানীয় প্রবীণ মুসল্লিদের মতে, মসজিদটি এক সময় মাটির নিচে চাপা ছিল। উঁচু মাটির ঢিবি দেখে স্থানীয়রা এক সময় মাটি কেটে মসজিদের কিছু অংশ বের করেন। পরে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে বারোবাজারে খনন কাজ শুরু হয়। এই সময় গোড়ার মসজিসহ আশপাশের আরও কয়েকটি প্রাচীন মসজিদ আবিষ্কৃত হয়। মসজিদের পূর্বদিকে ছিল একটি বড় শান বাঁধানো দিঘি, যা এখন থাকলেও শান বাঁধানো ঘাটটির অস্তিত্ব নেই।


মসজিদের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অনন্য। দেওয়ালের প্রস্থ প্রায় ৫ ফুট, এবং মসজিদটি বর্গাকৃতির। পূর্বদিকে তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে—মধ্যেরটি বড়, দুপাশের দুটি ছোট। উত্তর ও দক্ষিণের দেওয়ালে মোট চারটি প্রবেশপথ ছিল, যা বর্তমানে জানালার আকারে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিমের দেওয়ালে তিনটি মেহরাব আছে। তিন পাশে চারটি কালো পাথরের পিলার দৃঢ়তার সঙ্গে স্থাপত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। দেওয়ালে পোড়ামাটির কারুকার্য, শিকল, ঘন্টাসহ বিভিন্ন নকশা, পারস্য ও ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর ছাপ ফুটে উঠেছে।


বর্তমানে মসজিদে স্থানীয় মুসল্লিরা নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগী করেন। এছাড়া দেশি-বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীরা প্রতিদিন মসজিদটি দেখতে আসেন। গোড়ার মসজিদ ছাড়াও বারোবাজারে আরও বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। মসজিদ দেখতে যেতে ঝিনাইদহ বা যশোর শহরে আসতে হবে। ঝিনাইদহ থেকে যশোরগামী যাত্রীবাহী বাসে বারোবাজার পৌঁছাতে হবে, এরপর অটোভ্যান, ইজিবাইক বা ছোট যানবাহনে সহজেই মসজিদে পৌঁছানো যায়।


গোড়ার মসজিদ শুধুমাত্র একটি স্থাপত্য নিদর্শন নয়; এটি ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সুফি চর্চার এক অনন্য মিলনস্থল। এর প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে শতাব্দী পুরনো কাহিনী, যা স্থানীয় এবং প্রবাসী দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। 


মো: জিত বাবু, মহেশপুর, ঝিনাইদহ্।